#বায়াত হওয়ার আবশ্যকতা

বন্ধুগণ! এই পৃথিবীতে কোনো কিছু শিখিবার বা জানিবার কি বুঝিবার প্রয়োজন হইলে একজন জ্ঞানী লোকের সাহায্য ব্যতীত জানা চিনা যায় না। ‘পীর’ ফার্সী শব্দ, বাংলায় ‘গুরু’ এবং কুরআনের ভাষায় ‘মুর্শিদ’। (পীর বা গুরু) গু-শব্দের অর্থ আঁধার বা অন্ধকার, আর রু-শব্দের অর্থ আলো। যে ব্যক্তি জ্ঞানের আলো দ্বারা আমার মনের অন্ধকারকে দূর করিয়া দিতে পারে, সেই ব্যক্তিই হয়েছে আমার গুরু। পীরের পায়রবী করিয়া তালিম তত্ত্ব বা ইলমে তাসওয়াফের জ্ঞান অর্জন করিয়া নিজেকে চিনিয়া নবীজির ছিলছিলা মোতাবেক খিলাফত প্রাপ্ত হয়েছে এবং চরিত্র গঠন করেছে, সেই হয়েছে খাঁটি পীর। এইরূপ পীরের খেদমতে থাকিয়া যে ব্যক্তি খোদা ও বান্দার পরিচয় করিয়া কু-প্রবৃত্তি বর্জন করিয়া হালাল-হারাম বুঝিয়া ইনছাফ মতো চলিতেছে, সেই ইনছানে গণ্য হওয়ার যোগ্য। তাঁর ঈমান পাঁকা হয়েছে, আর অন্ধ বিশ্বাস টলমল ইমান ,তাই ক্ষনস্থায়ী। আমি একজন মানুষ আবার যাহাকে পীর ধরিব তিনিও একনজ মানুষ তবে কেন আমি অন্যের তাবেদারী করিব? তাবেদারী করার কারণ হলো আমার মাঝে শিক্ষার অভাব রয়েছে তাহা পূরণের জন্য। অজানা জানিতে, অচিনা চিনিতে ও অদেখা দেখিবার জন্যেই পীরের দরকার।

আর আহলে বায়াত ও তাদের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করার কথা পূর্বেই বিস্তারিত আলোচনা করিয়াছি। মূলত সেখান থেকেই ইসলামে বায়াত গ্রহণ করাকে ফরয করা হয়েছে। তবুও ওহাবী ও ইয়াজিদ পন্থি ভন্ড আলেমগণ বলিয়া থাকেন যে, পীর ধরিবার কোনো আবশ্যকতা নেই। অনেকে আবার ইহাও প্রচার করিয়া থাকেন যে, পীর ধরা বিদয়াত, শিরক ইত্যাদি আরো বহু কিছু। ইহারাই মূলত সেসব আলেম, যাহারা নবীর আহলে বায়াতকে কারবালার ময়দানে শহীদ করেছিল। এরা তাদেরই উত্তরসূরী, যাহারা ক্ষমতার লোভে মাওলা আলীর সাথে যুদ্ধ করিয়া ছিল। এসব আলেম সম্প্রদায় কুরআন ও হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা করিযা সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের ধোঁকা দিতেছে। পীরের হাতে বায়াত হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন মাজীদে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করিয়াছেন যে-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ-

“ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা আমানুত তাকুল্লাহা ওয়াবতাগু ইলাইহিল ওয়াছিলাতি ওয়া জাহিদু ফি ছাবিলিহি লায়াল্লাকুম তুফলিহুন।” অর্থাৎঃ হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর এবং একজন কামেল মুর্শিদকে ওছিলা হিসেবে তালাশ কর। যদি মুক্তি পাইতে আশা করিয়া থাকো। (সূরা মায়েদাঃ আয়াত ৩৫)

 

এছাড়াও কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সঃ) এর তাবেদারী করার পাশাপাশি পীরের পায়ররবী করার আদেশ করেছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ ۖ-

“ইয়া আইয়ু হাল্লাজিনা আমানু আতিয়ুল্লাহা ওয়া আতিয়ুর রাসূলা ওয়া ওলিল আমরি মিনকুম।” অর্থাৎঃ“হে আমানু তথা বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য কর এবং আনুগত্য কর নায়েবে রাসূল তথা তোমাদের মধ্য হতে যারা ইমাম তাহাদের আনুগত্য কর। (সূরা নিসাঃ আয়াত ৫৯)।”

 

অত্র আয়াত দুটি দ্বারা স্পষ্টই বুঝা যায় যে ইসলামের পথে অর্থাৎ নিজেকে সীরাতুল মুস্তাকীমের উপর অবিচল রাখতে হলে অবশ্যই প্রত্যেককে পীরের হাতে বায়াত গ্রহণ করতে হবে। কারণ যখন আপনি পীরের হাতে হাত দিয়া বায়াত গ্রহণ করিবেন, তখনই আপনি ইসলামে দাখিল হইবেন। কারণ বায়াতহীন ব্যক্তির কোনো ইসলাম নেই। যে বায়াত হইবে না বা হওয়ার পর তা প্রত্যাখ্যান করিবে সে জাহেল এবং বেধর্মী অর্থাৎ ইসলাম থেকে বহিঃস্কার হয়ে যাবে। আর বায়াত না হওয়া অবস্থায় যদি কেহ মৃত্যুবরণ করেন, তবে সে নরকে গমন করিবে। কেননা দ্বীনের নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ফরমাইয়াছেন- “মান খালায়া ইয়াদান মিন তয়াতিন লাকিয়াল্লাহা ইয়াওমাল কিয়ামাতি ওয়া লা হুজ্জাতুন লাহু ওয়া মান মাতা ওয়া লাইছা ফি উনুকিহী বাইয়াতু মাতা মিতাতীন জাহেলিয়াহ্।” অর্থাৎঃ যে ব্যক্তি (পীরের) আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নিল, সে যখন কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে মিলিত হইবে, তখন আল্লাহর পাঁকড়াও থেকে বাঁচিবার কোনো যুক্তি প্রমাণ বা দলিল তাহার নিকট থাকিবে না। আর যে ব্যক্তির মৃত্যু বায়াত ছাড়া হইলো, সে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের উপর মৃত্যুবরণ করিল। (সহীহ মুসলিম) ।

 

পীরের হাতে বায়াত হওয়াই হল রাসূলের হাতে বায়াত হওয়া। পীরের পায়রবী করাই হলো রাসূলের পায়রবী করা। পীরের অবাধ্য হওয়া মানেই হইলো রাসূলের আদেশ অমান্য করা। আর রাসূলের আদেশ অমান্য করা মানেই হলো আল্লাহর আদেশ অমান্য করা। পীরের হাতে বায়াত হওয়ার অর্থই হলো আল্লাহর হাতে বায়াত হওয়া। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন যে-

إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ

“ইন্নাল্লাজিনা ইউবাইয়ুনাকা ইন্নামা ইয়ুবাইয়ুনাল্লাহা ইয়াদুল্লাহি ফাওকা আইদিহীম।” অর্থাৎঃ (হে নবী!) নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আপনার হাতে বায়াত গ্রহণ করিল, সে মূলত আল্লাহর হাতেই বায়াত গ্রহণ করিল। কেননা আপনার হাতের উপরই ছিল আল্লাহর হাত। (সূরা ফাতাহ্ আয়াত ১০)।

 

এ বিষয়ে আরেকটি হাদীস উল্লেখযোগ্য যে, রাসূল (সঃ) ইরশাদ করেন-“ওয়া মাই ইয়ুতিয়ুল আমিরা ফাকাদ আতয়ানী ওয়ামান ইয়া’ছিল আমিরা ফাকাদ আ’ছানী।” অর্থাৎঃ আর যে স্বীয় পীর তথা আমিরের আনুগত্য করিল, সে মূলত আমারই আনুগত্য করিল, আর যে নিজের পীরকে অমান্য করিল সে মূলত আমাকেই অমান্য করিল। (সহীহ্ বুখারী ও মুসলিম)।

 

কিয়ামতের দিনও আল্লাহ তায়ালা সবাইকে যার যার পীরের নামে ডাকিবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَوْمَ نَدْعُو كُلَّ أُنَاسٍ بِإِمَامِهِمْ-

“ইয়াত্তমা নাদয়ু কুল্লু আনাছিন বিইমামিহীম।” অর্থাৎঃ (সেই দিনকে ভয় করো) যেদিন প্রত্যেক মানুষকে তার তার নিজের পীরের নামে আহবান করা হইবে। (সূরা বনী ইসরাইল ঃ আয়াত ৭৯)।

 

আর সেদিন যাদের পীর থাকবে না, তাহাদের পীর হইবে স্বয়ং আজাজিল শয়তান এবং তাহাদের বাসস্থান হইবে জাহান্নাম। বিখ্যাত মুসলিম মনীষী হযরত জুনায়েদ বোগদাদী (রহঃ) বলিয়াছেন- “মান লাইছা লাহু শাইখুন, ফাশাইখুহুশ শাইতন” অর্থাৎঃ যাহার পীর নাই, তাহার পীর হইলো শয়তান।

 

পৃথিবীতে যত হাক্কানী ইসলামী আলেম ও ইমাম ছিলেন তাহারা সবাই পীর ধরিয়া ছিলেন। এমনকি ইমামে আযম ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) ও পীর ধরিয়া ছিলেন। তিনি তার মুর্শিদ ইমাম বাকের (রহঃ) সম্পর্কে বলিয়াছেন যে- “লাও লা ছানাতানে হালাকা নুমান” অর্থঃ “নুমান (ইমাম আবু হানীফার কুনীয়াত) যদি ইমাম বাকের (রহঃ) এর নিকট  গোলামী সিকার না করিত (ইলমে মারফত অর্জন না করিত), তাহলে নুমান ধ্বংস হইয়া যাইতো”(হযরত আবুহানিফার আরেক নাম নুমান)

 

এছাড়াও বাকী তিন মাযহারের ইমামগণের শায়েখ ছিল। মাওলানা জালালুদ্দীন রুমী (রঃ) এর পীর ছিলেন হযরত শাম্ছ তাবরীজ (রহঃ), তাফসীরে কাবীরের লেখক ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী (রহঃ) এর পীর ছিলেন হযরত জালাল উদ্দীন কোবরা (রহঃ) এবং ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) এর পীর ছিলেন হযরত আবু আলী ফারমাদীর (রহঃ)।

পীর ধরার ব্যাপারে আরো হাজারো দলীল রইয়াছে। যাহারা হেদায়েত পাওয়ার, তাহারা এখান থেকেই হেদায়েত পাইবে। কারণ হেদায়েতের মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। হেদায়েত প্রাপ্ত মানুষদের ব্যাপারে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-

مَنْ يَهْدِ اللَّهُ فَهُوَ الْمُهْتَدِ ۖ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ وَلِيًّا مُرْشِدً-

“মাই ইয়াহ্দিল্লাহু ফাহুয়াল মুহ্তাদ-ওয়া মাই ইয়ুদ্লিল ফালান তাজিদা লাহু ওয়ালিয়াম মুরশিদা” অর্থাৎঃ আল্লাহ যাহাকে হেদায়েত দেন, শুধু সেই হেদায়েত পায়। আর যাকে পথ ভ্রষ্ট করেন, সে কখনো কোনো কামেল ওলীকে নিজের মুর্শিদ তথা পীর অর্থাৎ পথ প্রদর্শক হিসেবে পাইবে না। (সূরা কাহাফঃ আয়াত ১৭)।

 

সার কথা হইলো, মানুষের উছিলায় দুনিয়াতে আসা হইয়াছে। আবার জায়গা মত যেতে হলেও একজন সৎ ও জ্ঞানী মানুষের সঙ্গ নিতেই হইবে। নচেৎ জায়গায় পৌঁছানো যাবে না। দয়াময় আল্লাহ্ আমাদের সকলকে সঠিক জ্ঞান ও বুঝ, দান করুক। আমীন।


Translate »